ঘামের দামে ভোর
মোঃ বুলবুল হোসেন
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। আকাশের পূর্বদিগন্তে হালকা লালচে রেখা ফুটে উঠেছে মাত্র। শহরের প্রান্তে ছোট্ট একটি বস্তিতে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে জীবন। টিনের চালের ওপর রাতের শিশির টুপটাপ করে পড়ছে, আর সেই শব্দ যেন নতুন দিনের ডাক।
রহিম মিয়া চোখ মেলল। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, কিন্তু শরীর দেখে তা বোঝার উপায় নেই। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম তাকে সময়ের আগেই বুড়ো করে দিয়েছে। পাশে শুয়ে আছে তার স্ত্রী আমেনা, আর মাটির বিছানায় গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে তাদের একমাত্র ছেলে সুমন।
আজ ১লা মে।
রহিম মিয়া একটু থেমে গেল। তার চোখে এক অদ্ভুত ভাবনা খেলে গেল। বহু বছর ধরে সে এই দিনটাকে চেনে কিন্তু কখনো উদযাপন করার সুযোগ হয়নি। এই দিনটা যেন অন্যদের জন্য উৎসব, আর তার জন্যও ঠিক আগের দিনের মতোই কাজের দিন।
উঠবা না, আমেনা আধো ঘুমে বলল।
হ, উঠতেছি। আজ কাজটা একটু আগেই ধরতে হবে, রহিম মিয়া উত্তর দিল।
কিন্তু তার গলার স্বরটা যেন আজ একটু আলাদা। একজন শ্রমিকের জীবন
রহিম মিয়া একটি নির্মাণ শ্রমিক। শহরের একের পর এক উঁচু ভবন গড়ে ওঠে তার মতো হাজারো শ্রমিকের হাতে। কিন্তু সেই ভবনের কোনো একটিতে থাকার স্বপ্নও সে দেখতে পারে না। প্রতিদিন ভোরে উঠে, এক মুঠো ভাত খেয়ে, সে চলে যায় কাজের সাইটে। দিনভর ইট বয়ে, বালু টেনে, রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে তারপর সন্ধ্যায় ফিরে আসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে।
আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কিন্তু সুমন আজ তাকে ডাকল
বাবা, আজ স্কুলে স্যার বলছিলেন আজ মে দিবস। শ্রমিকদের দিন। তুমি কি আজ কাজ করবা? রহিম মিয়া থেমে গেল।
সে ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল,
হ, বাবা… আমাদের জন্যই তো এই দিন। তাই কাজ থামাইলে কেমনে চলবে?
সুমন বুঝল না। কিন্তু তার ছোট্ট চোখে একটা প্রশ্ন রয়ে গেল।
মে দিবসের গল্প স্কুলে সুমনের শিক্ষক আজ গল্প বলেছিলেন।
১৮৮৬ সালের কথা। আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। তারা চেয়েছিল মানুষের মতো বাঁচতে। কিন্তু সেই দাবির জন্য তাদের প্রাণ দিতে হয়েছিল। সুমন সেই গল্প শুনে অবাক হয়েছিল।
মানুষ কি শুধু কাজ করেই বাঁচে? সে নিজেকে প্রশ্ন করেছিল। কর্মস্থলে বাস্তবতা
রহিম মিয়া পৌঁছাল নির্মাণ সাইটে। আজ কাজ একটু বেশি। কারণ মালিক বলেছে এই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে।
সহকর্মী করিম বলল,আজ তো মে দিবস, একটু ছুটি দিলে পারত! আরেকজন হেসে বলল এইসব দিবস গরিবের জন্য না রে ভাই।
সবাই হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না ছিল অভ্যস্ত বেদনা।
একটি দুর্ঘটনা
দুপুরের দিকে হঠাৎ একটা শব্দ
ধপ!একজন শ্রমিক, নাম জসিম, উপর থেকে পড়ে গেছে। চারদিকে হুলস্থুল পড়ে গেল।
রহিম মিয়া ছুটে গেল। দেখল, জসিমের শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে।হাসপাতালে নিতে হবে! সে চিৎকার করল।কিন্তু মালিকের লোকজন বলল,আগে দেখো কী অবস্থা… পুলিশ কেস হলে ঝামেলা হবে।
রহিম মিয়ার চোখ লাল হয়ে উঠল।
মানুষ মরতেছে, আর আপনারা হিসাব কইরা দেখতেছেন? সে আর কথা না বলে নিজের কাঁধে তুলে নিল জসিমকে।
মানবতার পরীক্ষা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার বললেন, সময়মতো আনছেন, বাঁচার সম্ভাবনা আছে।
রহিম মিয়া চুপচাপ বসে রইল।
তার মাথায় ঘুরছিল
আজ মে দিবস। অথচ একজন শ্রমিক আজও নিরাপদ না।
বাড়িতে অপেক্ষা
বিকেলে সুমন স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে না দেখে মাকে জিজ্ঞেস করল
বাবা এখনো আসে নাই কেন? আমেনা চিন্তিত হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই রহিম মিয়া ফিরল।
তার শরীরে ধুলো, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ভেতরে যেন অন্য কিছু।আজ একজনের জীবন বাঁচাইছি,সে ধীরে বলল।
একটি উপলব্ধি রাতে খাবার সময় সুমন বলল
বাবা, তুমি হিরো! রহিম মিয়া হেসে ফেলল।
হিরো না বাবা… আমরা সবাই মানুষ। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াইলে সেটাই বড় কথা।
পরিবর্তনের শুরু পরদিন সকালে শ্রমিকরা একসাথে জড়ো হলো।রহিম মিয়া বলল,আমরা কাজ করব, কিন্তু নিরাপত্তা চাই। আমরা মানুষ, মেশিন না। প্রথমে কেউ সাহস পাচ্ছিল না।
কিন্তু একে একে সবাই এগিয়ে এল।