কুপির আলোয় গড়া স্বপ্ন
মোঃ বুলবুল হোসেন
গ্রামের নাম ছিল স্বপ্নপুর। নদীর ধারে ছোট্ট এক জনপদ চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, কাঁচা রাস্তা, বাঁশঝাড় আর সন্ধ্যা নামলেই গভীর অন্ধকার। তখনো গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। রাত মানেই কুপির আলো, হারিকেনের ক্ষীণ শিখা, আর আকাশভরা তারা।
এই গ্রামেই বাস করত এক পরিবার হাজী আবদুল করিম, তার স্ত্রী আমেনা বেগম, আর তাদের তিন সন্তান বড় ছেলে রশিদ, মেজো মেয়ে রাবেয়া, আর ছোট ছেলে হাশেম।
হাজী করিম ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষদের একজন। সম্পদে ধনী না হলেও, চরিত্রে ছিলেন পরিপূর্ণ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সততা, আর মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এই তিনটি জিনিস তাকে আলাদা করে তুলেছিল সবার কাছে।
গ্রামে যখন কোনো ঝগড়া হতো, সবাই দৌড়ে যেত করিম সাহেবের কাছে। তার একটি কথাই যেন শেষ কথা। মানুষ বলত,
করিম ভাইয়ের মুখে আল্লাহর ভয় আছে, তাই তার বিচারেও ভুল নাই।
এক সন্ধ্যায়, যখন আকাশে লাল আভা মিলিয়ে যাচ্ছিল, রশিদ মাঠ থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফিরল। ঘরে ঢুকতেই দেখল মা কুপির আলোয় ভাত বেড়ে দিচ্ছেন।
রশিদ বলল,
মা, আজ খুব কষ্ট হইছে। সারাদিন রোদে কাজ করছি, কিন্তু ফসল ভালো হইতেছে না।
আমেনা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
কষ্ট না করলে কি সুখ আসে রে বাবা? আল্লাহ আছেন, দেখবা ঠিকই ব্যবস্থা করবেন।
এই কথাগুলো শুনে রশিদের মনে একটু শান্তি এল। সে জানত, তার মা কখনো হতাশার কথা বলেন না। এই পরিবারটির একটা স্বপ্ন ছিল রশিদকে পড়াশোনা করিয়ে বড় মানুষ বানানো। যদিও গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ মনে করত, গরিবের ছেলে পড়াশোনা করে কি হবে? তবুও করিম সাহেবের বিশ্বাস ছিল অন্যরকম।
তিনি প্রায়ই বলতেন,
জ্ঞান এমন এক আলো, যেটা কুপির আলো না একবার জ্বইলা উঠলে আর নিভে না।”
কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই অভাব।
রশিদ দিনের বেলা কাজ করত, আর রাতে কুপির আলোয় পড়াশোনা।
অনেক সময় তেলের অভাবে কুপির আলো নিভে যেত। তখন সে আকাশের চাঁদের আলোয় বই খুলে বসে থাকত।
একদিন রাবেয়া বলল,
ভাইয়া, এত কষ্ট করো ক্যানো?
রশিদ হেসে বলল,
একটা স্বপ্ন আছে রে। সবাইরে ভালো রাখার স্বপ্ন।
গ্রামে তখন মানুষজন খুব ধর্মপ্রাণ ছিল। রাতের বেলা মসজিদে মিলাদ হতো, কেউ অসুস্থ হলে সবাই মিলে দোয়া করত।
একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সবাই মিলে করিম সাহেবকে ডাকল।
তিনি গিয়ে বৃদ্ধের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করলেন। শেষে বললেন,
সবকিছু আল্লাহর হাতে। আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি।
বৃদ্ধের ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
চাচা, যদি আমার বাবা ভালো হয়
করিম সাহেব তার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
আলহামদুলিল্লাহ বলতে শিখো। সুখে যেমন বলবা, দুঃখেও তেমন বলবা।
এই কথাটা গ্রামের মানুষদের মনে গভীরভাবে বসে গিয়েছিল।
সময়ের সাথে সাথে অভাব আরও বেড়ে গেল। ফসল ভালো হচ্ছিল না, নদী ভাঙন শুরু হলো।
একদিন রাতে করিম সাহেব চুপচাপ বসে ছিলেন। আমেনা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
কী চিন্তা করতেছেন?
তিনি ধীরে বললেন,
রশিদের পড়াশোনা কিভাবে চালামু, বুঝতেছি না।
আমেনা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
আমার সোনার কানের দুলটা বিক্রি কইরা দেন।
করিম সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন,
ওটা তো তোমার বিয়ের সময়ের স্মৃতি!
স্মৃতি দিয়ে কি করুম? ছেলের ভবিষ্যৎ বড়।
এই কথায় করিম সাহেবের চোখে পানি চলে এল। তিনি বুঝলেন—এই পরিবারের শক্তি শুধু অর্থ না, ভালোবাসা আর ত্যাগ।
দুল বিক্রি করে রশিদের পড়াশোনা চলতে লাগল। কিন্তু গ্রামের অনেকেই কটাক্ষ করত।
এইসব পড়ালেখা করে কি হবে? শেষে আবার মাঠেই কাজ করতে হবে!”
রশিদ এসব কথা শুনে কষ্ট পেত, কিন্তু কিছু বলত না।
রাতে সে আল্লাহর কাছে দোয়া করত,
আমারে শক্তি দেন। আমি যেন বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে পারি।
একদিন হঠাৎ করিম সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জ্বর, কাশি—ক্রমে অবস্থা খারাপ হতে লাগল।
ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা ছিল না। গ্রামের হাকিম দিয়ে চিকিৎসা চলছিল।
রশিদ ভেঙে পড়ল।
সে বলল,
আমি শহরে যামু, কাজ করমু, টাকা আনমু।
করিম সাহেব দুর্বল কণ্ঠে বললেন,
না বাবা তুই পড়াশোনা ছাড়বি না।
কিন্তু আপনার চিকিৎসা?
আল্লাহ আছেন… তুই শুধু দোয়া কর।
কয়েকদিন পর করিম সাহেব মারা গেলেন।
পুরো গ্রাম শোকাহত হয়ে পড়ল।
তার জানাজায় এত মানুষ হয়েছিল, যেন পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছে।
রশিদ বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।
কিন্তু শেষে সে বলল
আলহামদুলিল্লাহ।
লোকজন অবাক হয়ে তাকাল।
কেউ কেউ ফিসফিস করে বলল,
এই ছেলেটা বাবার মতোই।
বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল রশিদের কাঁধে।
সে দিনে কাজ করত, রাতে পড়াশোনা।
কখনো কখনো না খেয়েও দিন কাটাত।
রাবেয়া বলত,
ভাইয়া, তুমি এত কষ্ট করো ক্যানো?
একদিন সব ঠিক হইবো।
বছর কেটে গেল।
অবশেষে রশিদ পরীক্ষায় পাশ করল পুরো উপজেলায় প্রথম!
গ্রামে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।
মানুষ বলল,
এই ছেলেটা গ্রামের গর্ব!
রশিদ কেঁদে ফেলল।
মায়ের পা ধরে বলল,
এইটা তোমার দোয়ার ফল।
আমেনা বেগম শুধু বললেন,
আলহামদুলিল্লাহ।
এরপর রশিদ শহরে গিয়ে চাকরি পেল।
সংসারের অভাব ধীরে ধীরে দূর হতে লাগল।
একদিন সে গ্রামে ফিরে এল।
বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়
আমেনা বেগম এখনো কুপির আলো জ্বালিয়ে রাখেন।
রশিদ জিজ্ঞেস করল,
মা, বিদ্যুৎ তো আছে, কুপির দরকার কী?
তিনি হেসে বললেন,এই আলোতেই তো তোমার স্বপ্ন বড় হইছে।”