অভাবের আলো, প্রাচুর্যের অন্ধকার
মোঃ বুলবুল হোসেন
ছোটবেলায় আমাদের বাড়িটা ছিল মাটির, ছাউনি ছিল টিনের চালে বৃষ্টি নামলেই টুপটাপ শব্দে ঘুম ভাঙত। সেই শব্দে বিরক্ত হতাম না, বরং মনে হতো যেন আকাশ আমাদের জন্য গান গাইছে। সংসার ছিল অভাবের, কিন্তু মন ভরা ছিল অদ্ভুত এক শান্তিতে।
বাবা ছিলেন খুব সাধারণ মানুষ। দিনমজুরির কাজ করতেন। সকাল হলে একটা পুরনো গামছা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যেতেন, আর সন্ধ্যায় ফিরতেন ক্লান্ত শরীর নিয়ে। তাঁর চোখে তখনও একটা তৃপ্তির ছাপ থাকত আজকের দিনটাও তিনি লড়াই করে জিতেছেন।
ঈদের সময়টা ছিল আমাদের জন্য এক অন্যরকম অনুভূতি। গ্রামের অন্য ছেলেরা নতুন জামা পরে মাঠে ছুটে বেড়াত, আর আমরা পুরনো জামাটাকেই ধুয়ে-ইস্ত্রি করে নতুনের মতো বানিয়ে নিতাম। একবার মনে আছে, বাবা খুব কষ্ট করে আমাকে একটা সস্তা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলেন। কাপড়টা খুব ভালো ছিল না, কিন্তু বাবার মুখে যে হাসিটা দেখেছিলাম, সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দামী উপহার। সেদিন বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝি সেই অভাবের মাঝেই ছিল আসল সুখ। আমরা কম পেতাম, কিন্তু একে অপরকে বেশি করে ভালোবাসতাম।
সময় বদলেছে।
আজ আমি নিজে বাবা। শহরে একটা ভালো চাকরি করি। সংসারে অভাব নেই ছেলেমেয়েদের জন্য যা চাই, তাই কিনে দিতে পারি। ঈদে তারা একাধিক জামা পায়, নতুন মোবাইল, খেলনা সবকিছু। তবুও কোথায় যেন একটা শূন্যতা রয়ে গেছে।
একদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে দেখি, ছেলে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। আমি ক্লান্ত গলায় ডাকলাম, বাবা, একটু পানি দেবে?
সে চোখ না তুলে বলল,
একটু পরে দিচ্ছি।
সেই একটু পরে আর আসে না।
মেয়েটাও নিজের জগতে মগ্ন। তাদের কাছে আমি যেন শুধু একজন উপার্জনকারী মানুষ—একটা প্রয়োজন, কিন্তু অনুভূতির নয়।
সেদিন হঠাৎ করে বাবার কথা খুব মনে পড়ল। কতবার আমি তাঁর ক্লান্ত মুখ দেখে পানি এনে দিয়েছি, পাশে বসে গল্প শুনেছি। তিনি কখনো আমাদের কাছে কিছু চাননি, তবুও আমরা তাঁর প্রতি সম্মান আর ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছিলাম।
আজ আমি সব দিতে পারছি, তবুও কিছু একটা দিতে পারছি না—হয়তো সেই শিক্ষা, সেই মূল্যবোধ, যা বাবা আমাদের দিয়েছিলেন।
রাতে বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, সেই টিনের চালের শব্দগুলো যেন আবার শুনতে পাই। মনে পড়ে বাবার ঘামে ভেজা মুখ, তাঁর অল্পে তুষ্ট থাকার হাসি।
হয়তো সুখ মানে সবকিছু পাওয়া নয়,
হয়তো সুখ মানে একে অপরকে বুঝতে পারা, সম্মান করতে পারা।
আমাদের জীবনে অভাব কমেছে,
কিন্তু কোথায় যেন মানবিকতার আলোটা একটু একটু করে ম্লান হয়ে গেছে।
বাবা আমাদেরকে একটা কথা বলতেন,
সংসার শুধু টাকা দিয়ে চলে না, মন দিয়েও চালাতে হয়।
আমি নিঃশব্দে মাথা নিচু করি।
কারণ বুঝতে পারি।
অভাবের সংসারটা হয়তো গরিব ছিল,
কিন্তু হৃদয়ের দিক থেকে আমরা তখনই সবচেয়ে ধনী ছিলাম।