অচেনা ভিড়ে এক চেনা আশ্রয়
মোঃ বুলবুল হোসেন
সেদিন ভোর থেকেই মনটা ছিল অস্থির পাখির মতো। মা খুব ভোরে ঘুম ভেঙে আমাকে গোসল করিয়ে পরিয়ে দিলেন নতুন পাঞ্জাবি। খড়খড়ে কাপড়ের গায়ে তখনও দোকানের গন্ধ লেগে। বাবা আগের রাতেই শহর থেকে এনে দিয়েছিলেন সেটি। কিন্তু নতুন জামার আনন্দকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিল মেলায় যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে।
বাড়ির ভেতর তখন উৎসবের ব্যস্ততা কেউ রান্নায়, কেউ সাজগোজে। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি দরজার পাশে, যেন অপেক্ষার প্রহর গুনছি। বাবার একটু দেরি হচ্ছিল। কিন্তু ছোট্ট মন কি আর অপেক্ষা বোঝে? অজানা এক টানে, চুপিচুপি দরজা পেরিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম একাই—গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে। মনে হচ্ছিল, দূর থেকে ভেসে আসা ঢোলের তালে তালে মেলাই যেন আমাকে ডেকে নিচ্ছে।
মেলায় পৌঁছে চোখ যেন থমকে গেল। চারদিকে মানুষের ঢেউ, রঙের উল্লাস, শব্দের মেলা। নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ, রঙিন চুড়ির ঝুনঝুনি, খই-বাতাসার মিষ্টি গন্ধ, আর ছোট ছোট দোকানে সাজানো খেলনার বাহার—সব মিলিয়ে এক জাদুর জগৎ।
আমি এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটে বেড়াতে লাগলাম। হঠাৎ এক কোণে চোখে পড়ল এক বৃদ্ধ—কাঠের বাঁশি বিক্রি করছেন। বাঁশিগুলো রোদে চিকচিক করছে। একটি বাঁশি হাতে নিয়ে ঠোঁটে তুলতেই মনে হলো যেন কোনো অচেনা সুর আমাকে ছুঁয়ে গেল। কিন্তু পকেটের সামান্য টাকায় তার দাম মেলেনি। মনখারাপের এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁশিটা রেখে দিলাম।
ঠিক তখনই বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে উঠল এক অজানা ভয়। পেছনে তাকিয়ে দেখি—চেনা কোনো পথ নেই। যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম, তা যেন মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। চারপাশে শুধু অচেনা মুখ, অচেনা শব্দ।
মুহূর্তেই রঙিন মেলাটা আমার কাছে ধূসর হয়ে গেল। ঢোলের তালে আর আনন্দ লাগছিল না, বরং মনে হচ্ছিল শব্দগুলো আমাকে গ্রাস করতে চাইছে। ছোট্ট আমি ভিড়ের মাঝে আরও ছোট হয়ে গেলাম। বুক ভেঙে কান্না আসতে লাগল—অঝোর ধারায়।
ঠিক তখনই এক বয়স্ক লোক আমার হাতটা আলতো করে ধরে ফেললেন। তাঁর চোখে ছিল বয়সের ছাপ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল মায়া। তিনি মৃদু স্বরে বললেন, “ভয় পেও না বাবা, তোমার কিছু হবে না।”
সেই কণ্ঠে এমন এক আশ্বাস ছিল, যা আমার কান্নাকে ধীরে ধীরে থামিয়ে দিল। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন মেলার এক কোণে, যেখানে মাইক সেট করা ছিল।
মাইকে যখন আমার নাম ঘোষণা হচ্ছিল, তখন সময় যেন থমকে গিয়েছিল। প্রতিটি মুহূর্ত মনে হচ্ছিল এক একটি দীর্ঘশ্বাস। চারপাশে তখনও মেলা চলছে—কেউ হাসছে, কেউ কিনছে, কেউ ঘুরছে। অথচ আমার ভেতরে তখন এক নিঃশব্দ শূন্যতা।
হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে এক পরিচিত ছায়া ছুটে এল। ধুলো উড়িয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে—বাবা। তাঁর মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ, চোখে অজস্র ভয়। আমাকে দেখেই তিনি ঝাঁপিয়ে জড়িয়ে ধরলেন।
সেই আলিঙ্গন—আজও আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
কোনো বকুনি নেই, কোনো রাগ নেই—শুধু শক্ত করে ধরা একজোড়া হাত।
বাড়ি ফেরার পথে গোধূলির আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছিল। পাখিরা ফিরে যাচ্ছিল আপন নীড়ে। সেই নরম আলোয় বাবা আস্তে করে বললেন,
“এভাবে কখনো একা বের হতে নেই বাবা… আপনজনের হাত ছেড়ে দিলে পৃথিবীটা খুব অচেনা হয়ে যায়।”
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু তার গভীরতা আমি বুঝেছি বড় হয়ে।
আজও পহেলা বৈশাখ আসে, মেলা বসে, ঢোল বাজে। কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া দুপুরটি আর ফিরে আসে না—শুধু স্মৃতির ভাঁজে থেকে যায়।
সেই দিনের ভয়, সেই অঝোর কান্না, আর শেষে বাবার হাতের দৃঢ় স্পর্শ আমাকে শিখিয়েছে—
জীবনের যত রঙিন মেলা থাকুক, যত কোলাহল থাকুক, শেষ আশ্রয়টা সবসময় আপনজনের হাতেই।
শৈশব হয়তো হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে, কিন্তু বৈশাখ এলেই আমি আবার ফিরে যাই—
সেই ছোট্ট আমিতে,
সেই ধুলোমাখা পথে,
সেই মেলার ভিড়ে—
যেখানে হারিয়ে গিয়ে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা।