ঈদ আনন্দ
মোঃ বুলবুল হোসেন
অনেক বছর পর ট্রেনের জানালার পাশে বসে ছিল আরমান। শহরের কংক্রিটের ভিড়, যানজট আর ব্যস্ততার মাঝে সে যেন নিজের শৈশবটাকে কোথাও হারিয়ে ফেলেছিল। আজ সেই হারানো দিনগুলোর কাছে ফিরে যাওয়ার দিন। গন্তব্যতার দাদার বাড়ি, গ্রামের সেই চেনা উঠোন, যেখানে শৈশবের ঈদগুলো ছিল অন্যরকম।
আরমানের চোখে ভাসছিল ছোটবেলার স্মৃতি—ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ, নতুন জামার গন্ধ, ভোরবেলা দাদার হাত ধরে ঈদের নামাজে যাওয়া, আর নামাজ শেষে গ্রামের সবাইকে একে একে কোলাকুলি করা। কতদিন হয়ে গেল, সে আর সেই আনন্দগুলো ছুঁয়ে দেখেনি!
শহরের জীবন তাকে এমনভাবে ব্যস্ত করে ফেলেছিল যে, দাদার সঙ্গে ফোনে কথাও ঠিকমতো বলা হতো না। দাদা মাঝে মাঝে বলতেন,কিরে আরমান, এইবার ঈদে আসবি তো?
আরমান হাসিমুখে বলত, “ইনশাআল্লাহ দাদা, চেষ্টা করবো।
কিন্তু সেই চেষ্টা কখনো বাস্তবে রূপ নিত না।
এইবার যেন সবকিছু অন্যরকম। দাদার কণ্ঠে কিছুটা ক্লান্তি, কিছুটা আকুলতা টের পেয়েছিল সে। তাই আর দেরি করেনি। ছুটি নিয়েই রওনা দিয়েছে।
ট্রেন ধীরে ধীরে শহর ছাড়িয়ে সবুজের দিকে এগিয়ে চলল। জানালার বাইরে সারি সারি গাছ, বিস্তীর্ণ মাঠ, নদীর নীল জল—সবকিছু যেন তাকে ডাকছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের শিকড়ে ফিরে যাচ্ছে।
স্টেশন থেকে নেমে যখন রিকশায় করে গ্রামের পথে এগোচ্ছিল, তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছিল। দূরে কোথাও মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল। সেই সুরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছিল।
দাদার বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই বুকের ভেতর কেমন যেন ধকধক শুরু হলো। কতদিন পর এই বাড়ি! দরজার সামনে সেই পুরনো আমগাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, যেন আগের মতোই তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে কাঁপা কণ্ঠে ডাক এলো,কে?
আরমানের গলা যেন আটকে গেল। তবুও বলল, আমি দাদা… আরমান।
দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে দাদা—চোখে বয়সের ছাপ, চুল সাদা হয়ে গেছে অনেকটাই। কিন্তু সেই চোখের ভালোবাসা একটুও কমেনি।
দাদা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন, তারপর হঠাৎ করে আরমানকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
“তুই আসছিস! সত্যি আসছিস!
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
আরমানও নিজেকে সামলাতে পারল না। তার চোখে জল চলে এলো।
“দাদা, দেরি হয়ে গেছে… অনেক দেরি হয়ে গেছে।দাদা মৃদু হেসে বললেন,
“না রে, আসার জন্য কখনোই দেরি হয় না।”
সেই রাতে দাদার পাশে বসে অনেক গল্প হলো। দাদা গ্রামের খবর বললেন, কার বিয়ে হয়েছে, কার ছেলে বড় হয়েছে, কার ঘরে নতুন অতিথি এসেছে। আরমান মন দিয়ে শুনছিল, যেন প্রতিটি গল্প তার হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
রাতের খাবারে ছিল গরম ভাত, ডাল, দেশি মুরগির ঝোল আর দাদার প্রিয় ভর্তা। শহরের হাজারো রেস্টুরেন্টের খাবারের চেয়েও এই সাধারণ খাবার তার কাছে অনেক বেশি তৃপ্তির ছিল।ঈদের আগের রাত—চাঁদ দেখা হলো। গ্রামের মানুষজন উঠোনে, মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কেউ চিৎকার করে উঠল,
চাঁদ দেখা গেছে!চারদিকে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল।আরমানের মনে হলো, এই আনন্দটা শহরে কোথাও নেই। এখানে মানুষ একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়।
ঈদের দিন ভোরে দাদা তাকে ডেকে তুললেন।
“উঠ রে, নামাজে যেতে হবে।”
ছোটবেলার মতোই দাদা তার জন্য পাঞ্জাবি বের করে রেখেছেন। আরমান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“দাদা, তুমি এখনও…
দাদা হেসে বললেন,
তুই আসবি এই আশায় রেখে দিয়েছিলাম।
নামাজের পথে হাঁটতে হাঁটতে আরমানের মনে হচ্ছিল, সে যেন সময়ের পেছনে ফিরে গেছে। মসজিদের সামনে মানুষের ভিড়, সবাই নতুন জামা পরে এসেছে, মুখে হাসি।
নামাজ শেষে সবাই একে অপরকে কোলাকুলি করছে। কেউ বলছে, “ঈদ মোবারক!
এই শব্দগুলো তার হৃদয় ছুঁয়ে গেল।
বাড়ি ফিরে দাদা সেমাই রান্না করলেন। সেই স্বাদ—অতুলনীয়। দাদা নিজে হাতে আরমানকে খাইয়ে দিলেন।আরো খা, শহরে তো এসব খাস না।
আরমান হেসে বলল,দাদা, তোমার হাতের মতো স্বাদ কোথাও পাই না।”
দিনভর আত্মীয়স্বজন আসা-যাওয়া করল। ছোটরা সালাম করে সালামি নিচ্ছে, বড়রা গল্প করছে। বাড়ি ভরে উঠেছে আনন্দে।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও আরমান খেয়াল করল—দাদা মাঝে মাঝে চুপ করে যান। চোখে এক ধরনের শূন্যতা ভেসে ওঠে।
রাতে আরমান জিজ্ঞেস করল,
“দাদা, তুমি একা থাকো… কষ্ট হয় না?
দাদা একটু চুপ করে থেকে বললেন,
“কষ্ট তো হয়ই রে। কিন্তু তোর বাবার স্মৃতি, এই বাড়ি—সবকিছু ছাড়তে পারি না।
আরমানের বুকটা কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারল, শহরের ব্যস্ততায় সে কতটা দূরে সরে গিয়েছিল।
ঈদের পরের দিন সকালে দাদা তাকে নিয়ে গেলেন সেই পুরনো মাঠে, যেখানে ছোটবেলায় সে খেলত।
মনে আছে?
আরমান মাথা নেড়ে বলল,
“সব মনে আছে দাদা… শুধু আমি ভুলে গিয়েছিলাম।দাদা হেসে বললেন,
“ভুলে যাস না রে, মানুষ যত বড়ই হোক, শিকড় যেন না ভোলে। সেই মুহূর্তে আরমান একটা সিদ্ধান্ত নিল।সে দাদাকে বলল,
দাদা, আমি প্রতি ঈদেই আসবো। শুধু ঈদ না, মাঝেমধ্যেও আসবো।”
দাদার চোখে জল এসে গেল।
সত্যি বলছিস? হ্যাঁ দাদা, এবার আর মিথ্যা না।”
বিদায়ের দিন এসে গেল।
দাদা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন।
যা রে, ভালো থাকিস।”
আরমান দাদার হাত ধরে বলল,
“তুমি একা না দাদা, আমি আছি।
রিকশা যখন দূরে সরে যাচ্ছিল, আরমান পেছনে তাকিয়ে দেখল—দাদা এখনও দাঁড়িয়ে আছেন, হাত নাড়ছেন।
তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
শহরে ফিরে এসে আরমানের জীবন আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল। কিন্তু এবার তার ভেতরে একটা পরিবর্তন এসেছে।
সে জানে, তার একটা ঠিকানা আছে—যেখানে ফিরে গেলে সে নিজেকে খুঁজে পায়।
ঈদ শুধু নতুন জামা বা ভালো খাবারের নাম না
ঈদ হলো ভালোবাসার, সম্পর্কের, ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
আর সেই আনন্দের নামই
ঈদ আনন্দ।