নীলিমার চিরন্তন স্পর্শ”
মোঃ বুলবুল হোসেন
রাত গভীর।
কুয়াশা ঢাকা জানালার ওপাশে মৃদু শব্দে যেন কারও আঙুল কাচে ঠকঠক করছে। হৃদয় প্রথমে ভেবেছিল বাতাসের খেলা। কিন্তু শব্দটা নিয়মিত, একেবারে মানুষের আঙুলের মতো।
বুক ধড়ফড় করতে লাগল। ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। বাইরে কেবল সাদা কুয়াশার আস্তরণ। হঠাৎ অন্ধকার ভেদ করে এক নারীকণ্ঠ ভেসে এল—
—“আমাকে কেউ মনে রাখে না…”
হৃদয়ের গা শিউরে উঠল। মাথা ভার হয়ে এলো। কে এই অচেনা কণ্ঠ?
সকালে সে ঘটনাটা বন্ধু ইফতেখারকে বলল।
ইফতেখার হেসেই উড়িয়ে দিল—
—“তুই বেশি পড়াশোনা করছিস। মাথা গরম হয়ে গেছে।”
কিন্তু হৃদয় জানত, এটা তার কল্পনা নয়। রাতে শব্দটা আবার আসবে।
ঠিক তাই হলো। দ্বিতীয় রাতে জানালার ওপাশে ভেসে উঠল এক সাদা পোশাকের তরুণী। লম্বা চুল ভিজে আছে, যেন সদ্য বৃষ্টি ভিজে এসেছে। ঠোঁটে এক মায়ামাখা হাসি।
সে নরম স্বরে বলল—
—“তুমি কি আমার সাথে হাঁটবে?”
হৃদয়ের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। গলা দিয়ে কথা বের হলো না। শুধু জানালার কাচে জমে থাকা কুয়াশার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে রইল।
তৃতীয় রাতে হৃদয় আর স্থির থাকতে পারল না। জানালা খুলে দিল। ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে গেল ঘরে। তরুণী হাত বাড়িয়ে দিল। হৃদয় যেন অচেনা এক শক্তির টানে তার আঙুল ছুঁয়ে ফেলল।
মুহূর্তেই চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে গেল।
চোখ খুলতেই সে নিজেকে দেখতে পেল অচেনা এক মাঠে। আকাশে ম্লান চাঁদ, গাছপালার ফাঁকে শিউলি ফুলের গন্ধ। পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই তরুণী।
হৃদয় কাঁপা গলায় বলল—
—“তুমি… কে?”
তরুণী মৃদু হেসে বলল—
—“আমার নাম নীলিমা। আমি এই গ্রামে থাকতাম। অনেক বছর আগে বিয়ের রাতে নদীতে ডুবে গিয়েছিলাম। কেউ আমার জন্য কাঁদেনি, কেউ খুঁজেও দেখেনি। তাই এখনো আমি ফিরিনি।”
হৃদয়ের বুক কেঁপে উঠল।
পরদিন থেকে নীলিমা প্রতিদিন রাতে আসে। তারা দু’জন কথা বলে। নীলিমা শোনায় তার অসমাপ্ত জীবনের গল্প—কেমন করে বিয়ের শাড়ি পরে নদীর ঘাটে গিয়েছিল, কেমন করে হঠাৎ পা ফসকে জলে ডুবে গেল। আর কেউ খোঁজ নেয়নি।
হৃদয় শোনে আর স্তব্ধ হয়ে থাকে। তার ভেতর অদ্ভুত মায়া জমতে থাকে। মনে হয়, নীলিমাকে সে যতদিন না স্মরণ করছে, ততদিন সে একা ঘুরে বেড়াবে।
এক রাতে নীলিমা জিজ্ঞেস করল—
—“তুমি কি আমায় ভুলে যাবে?”
—“না, কোনোদিন না।”
কথাটা বলতেই নীলিমার চোখে জল চিকচিক করল।
দিন যায়, রাত যায়। হৃদয়ের পড়াশোনা, বন্ধু-বান্ধব—সব যেন গৌণ হয়ে যায়। সে শুধু রাতের অপেক্ষায় থাকে।
একদিন ইফতেখার লক্ষ্য করল—
—“তুই শুকিয়ে যাচ্ছিস। রাতে ঘুমাস না কেন?”
হৃদয় এড়িয়ে গেল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে জানত, তার জীবন এখন এক অদৃশ্য ডোরে বাঁধা।
রাতে নীলিমা তাকে আবার মাঠে নিয়ে গেল।
সেখানে এক কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল অসংখ্য ছায়া—কেউ বুড়ো, কেউ তরুণ, কেউ শিশু। সবাই যেন অপেক্ষমাণ আত্মা।
একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বলল—
—“সে আমাদের দলে যাচ্ছে।”
হৃদয় ভয় পেয়ে গেল।
—“না, আমি যাব না!”
নীলিমা তার হাত শক্ত করে ধরে বলল—
—“তুমি যদি আমায় মনে রাখো, তবে তোমাকে ছাড়ব না।”
হৃদয় কেঁপে উঠল। কিন্তু সে তার হাত ছাড়াতে পারল না। পরদিন সকালে হৃদয় দেখল, তার টেবিলে ভেজা শিউলি ফুল পড়ে আছে। বুক কেঁপে উঠল। এটা স্বপ্ন নয়।
দিনের পর দিন ফুল জমতে থাকে। বন্ধুরা তাকে দেখে ভাবে, সে হয়তো মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
মা একদিন জিজ্ঞেস করলেন—
—“তুই এত চুপচাপ কেন রে?”
হৃদয় উত্তর দিতে পারল না। কীভাবে বলবে, সে প্রতিরাতে এক মৃতার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে?
এক রাতে হৃদয় নীলিমাকে বলল—
—“তুমি কি সত্যিই চাও আমি তোমার সঙ্গে থাকি?”
নীলিমা নরম স্বরে বলল—
—“হ্যাঁ। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। আমি বেঁচে নেই, কিন্তু তোমার মনে আমি বাঁচতে চাই।”
হৃদয় দ্বিধায় পড়ল। জীবিত মানুষের জগতে তার পরিবার, বন্ধু, স্বপ্ন আছে। কিন্তু মৃতার চোখের টান উপেক্ষা করা যায় না।
রাত গভীর হলে হঠাৎ হৃদয় দেখল—জানালার বাইরে কেবল নীলিমা নয়, আরও অনেক মুখ ভেসে উঠছে। তারা ফিসফিস করছে—
—“এসো… আমাদের দলে এসো…”
হৃদয় চিৎকার করে উঠল। কিন্তু তার চিৎকার কেউ শুনল না।
সে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে বাইরে বের হতে চাইল। কিন্তু দেখল, দরজার ওপাশে শুধু ঘন অন্ধকার।
এরপর থেকে হৃদয়ের অবস্থার অবনতি হতে লাগল। সে দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিল। পড়াশোনা বন্ধ, ঘুম নেই। একদিন ইফতেখার তাকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু হৃদয় রাজি হলো না।
সে ফিসফিস করে বলল—
—“আমি যদি যাই, নীলিমা অভিমান করবে।”
ইফতেখার হতবাক। সে কিছুই বুঝতে পারছিল না।
শেষ রাতে নীলিমা এসে বলল—
—“আজ শেষবার তোমাকে ডাকতে এসেছি। তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?”
হৃদয় কেঁদে ফেলল।
—“আমি পারব না নীলিমা। আমার মা আছে, আমার বন্ধু আছে। আমি মরতে চাই না।”
নীলিমা থম মেরে দাঁড়াল। চোখ ভিজে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল কুয়াশায়।
কিন্তু যাওয়ার আগে সে মৃদু কণ্ঠে বলল—
—“যদি কোনোদিন আমায় মনে করো, আমি আবার ফিরব।সকালে হৃদয় ঘুম থেকে উঠে দেখল, টেবিলে আর কোনো ফুল নেই। জানালার বাইরে শুধু নীল আকাশ। কিন্তু বুকের ভেতর কেমন এক শূন্যতা বাজতে থাকল। ক’দিন পর ইফতেখার তাকে নিয়ে গেল গ্রাম্য নদীর ঘাটে। সেখানেই নাকি বহু বছর আগে এক বিয়ের কনে নদীতে পড়ে মারা গিয়েছিল।
নাম ছিল—নীলিমা।
হৃদয়ের গা কাঁপল।
সে নিরব নদীর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
“নীলিমা, আমি আছি…”
হঠাৎ বাতাসে ভেসে এলো ভেজা শিউলি ফুলের গন্ধ।